করোনাভাইরাস

ব্যবসায়ের উপর করোনার প্রভাব – এই অবস্থায় ব্যবসা বাঁচানোর উপায়



ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, কোনও মহামারী বা স্থানীয় কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব হলে, ব্যবসা ও অর্থনীতি কম বেশি ধীর হয়ে যায়। যখন এই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন ব্যবসা বাঁচানোর চেয়ে জীবন বাঁচানোই যেন প্রথম লক্ষ্য হিসাবে সামনে চলে আসে। বর্তমানে, COVID-19 সারা বিশ্বের ব্যবসায়ের উপর একই ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যে কারণে আপনারা যারা ব্যবসা করেন, তারা বুঝতে পারছেন না কি হতে পারে বা কি করা উচিৎ। আসুন দেখা যাক কি কি পদক্ষেপে আমরা এই পরিস্থিতিতেও নিজেরা টিকে থাকবো।

বিশ্ব যখন প্রযুক্তিগত, বাণিজ্যিক ও বৈশ্বিক অগ্রগতির দ্বারপ্রান্তে ছিল তখন উহান রাজ্য থেকে একটি ভাইরাস বের হয়ে বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি বিপন্ন করে তুলেছে। COVID-19 বা করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই এটাকে মহামারী বলাই যায়।

যখন বিশ্ব এই রূপ সঙ্কটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তখন বিশ্বজুড়ে সকল ব্যবস্থার সাথে সাথে ব্যবসাগুলিও মারাত্মক আকারে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দেশগুলিতে লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব মানতে যেয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ প্রায় বন্ধ অথবা সীমিত আকারে করতে হচ্ছে আর যাতে করে প্রতিদিন সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে। COVID-19 ব্যবসায়ের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে তাই আমাদের সকলের উপর এর প্রভাবগুলি সুস্পষ্ট এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক। যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে তা ধীরে ধীরে সমাজের সকল অংশে প্রভাব ফেলবে অর্থাৎ উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত।

এখন করোনা ভাইরাসের এই পরিস্থিতিতে, আপনারা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এই প্রতিকূল অবস্থাকে কিভাবে নিজেরা প্রভাবিত করতে পারবেন তা নিয়ে আলোচনা করবো এবং এই নিবন্ধের মাধ্যমে আমরা পরবর্তী সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার সুবিধাজনক প্রক্রিয়াগুলি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায় সমূহ সনাক্ত করার চেষ্টা করব।

বর্তমান ব্যবসা পরিস্থিতি

বর্তমান সময়ে কোনো ব্যবসাই খুব একটা ভাল কিছু দেখতে পাচ্ছে না, কারন ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। পৃথিবীতে এখন মূলত এই মুহুর্তে টেকসই এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই যেন মূল ফোকাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসাগুলি কিন্তু শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে অন্ধকার সময়টি দেখছে। বিশেষত, অল্প মূলধনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলি দেউলিয়া হওয়া শুরু করেছে।

মূলত ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় হতে ভাইরাসের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রায় সকল দেশই লকডাউন অথবা সামাজিক দূরত্ব এর মতো বিষয়গুলিতে আটকে যায়। প্রায় সকল দেশই তাদের শহর এবং প্রদেশগুলিকে এক রকম তালাবদ্ধ করে রেখে ছিল, তা ছাড়াও বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্কতো আছেই। আপাতত দৃষ্টিতে এটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে।

যাইহোক, বেশির ভাগ ব্যবসাই আন্তর্জাতিক লেনদেনের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে তাছাড়াও প্রতিটি ব্যবসা মানব জমায়েত করার পাশাপাশি ক্লায়েন্ট এবং গ্রাহকদের সাথে নিয়মিত সংযোগ রাখতে চায়। এখানেই ব্যবসা গুলি সব থেকে বেশি সমস্যায় পড়ছে। আন্তর্জাতিক বিমান ও অন্যান্য পরিবহনের স্বল্পতা ছাড়াও মানুষের আতঙ্ক ও লকডাউনের কারনে অনেক ছোট থেকে মাঝারি আকারের ব্যবসা খুব খারাপ সময় পার করছে।

ব্যবসায়ের উপর COVID-19 এর বিরূপ প্রভাব

COVID-19 বৈশ্বিক ব্যবসায়ে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই সংকট চলাকালীন সময়ে যে ব্যবসাগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেগুলি হ’ল ট্যুর এবং ভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত তা ছাড়াও অন্যান্য প্রায় সকল ব্যবসাও বটে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বন্দরগুলিতে বিধি নিষেধের কারনে ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলি তাদের অন্ধকার সময় দেখতে পাচ্ছে। বেশিরভাগ বিমানবন্দর এবং নৌপথগুলি মহামারী প্রকোপকে সীমাবদ্ধ করতে সীমিত করে রাখা হয়েছে।



এরপরে আসুন খাবার, রেস্তোঁরা ও এই রকম সকল ব্যবসা। রেস্তোঁরা বা স্ট্রিট ফুড ব্যবসা গুলি মারাত্মক ভাবে পড়ে গেছে। অন্যদিকে, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য কাঁচামাল সরবরাহেরও অভাব রয়েছে। বাজারে কম প্রাপ্যতা মানেই উচ্চমূল্যের কাঁচামাল। ফলশ্রুতিতে অনেক দেশের রেস্তোঁরা ও স্ট্রিট ফুড ব্যবসা গুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

অনেক দেশে আমদানি-রফতানি ব্যবসা রেড অ্যালার্টে রয়েছে। জলপথ, রোডওয়ে এবং বিমান বন্দরে বড় ধরনের বিধি নিষেধে রয়েছে। পণ্য আমদানি এবং রফতানি এখন খুব সীমিত। এর ফলে রফতানি, আমদানি খাত মারাত্মক অশান্তিতে রয়েছে।

ঠিক তেমনি ডে কেয়ার, পরামর্শ, বাড়ির কাজের মেয়ে, ফ্যাশন, পোশাক ও টেক্সটাইল, মেডিকেল, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক, ম্যানুফ্যাকচারিং, ব্যাংক, লিজিং, বাড়ি ভাড়া সহ প্রায় সমস্ত ব্যবসাই ২০১৯ সালের এর শেষ থেকেই করোনা ভাইরাস জনিত মহামারীটির কারনে খুব খারাপ সময় পার করছে।

এর পরের পরিস্থিতি কী হতে পারে?

COVID-19 এর মহামারীটির প্রভাব মানবজাতির জন্য আরও কঠিন হওয়ার পূর্বাভাস বহন করে। এই জাতীয় বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়া কোনো ভাবেই খুব সহজ নয়। করোনা ভাইরাস পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রত্যেক জাতির নিজস্ব কৌশল থাকতে হবে।

তবে এই মুহুর্তে, বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমান করা যায় যে COVID-19 প্রাদুর্ভাব থাকা অবস্থায় ও শেষ হওয়ার সাথে লক্ষ লক্ষ লোক বেকার হয়ে পড়বেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষ COVD-19 দ্বারা মারা গেছেন। সম্পূর্ণ সংবেদনশীলতা এবং স্বতন্ত্র বিবেকের উপর এটি প্রয়োগ না করা হলে এই সংখ্যাটি দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ হয়ে যেতে পারে অর্থাৎ মানুষের প্রত্যেকের সচেতনতা। অন্য দিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু মানে দক্ষতা, বুদ্ধি, উপাধি এবং অভিজ্ঞতার উপর একটি বিশাল ক্ষতি। জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার অভাব তখন ছোট বড় সকল সংস্থাগুলি খুব কঠিন ভাবে উপলদ্ধি করবে।

ব্যবসা, কর্মক্ষেত্র এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন, এই রোগ ছড়িয়ে যাওয়ার পরে বিশাল পরিবর্তন দেখতে পাবে। বিভিন্ন মহল এবং দেশগুলির কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত বা অজানা রোগের প্রাদুর্ভাবের ভয় এই মহামারীটির পরে নতুন উদ্বেগ এর কারন হতে পারে।

পরবর্তীতে ভার্চুয়াল শব্দের উপর একটি চমৎকার নির্ভরতা তৈরী হবে। ইন্টারনেট ব্যবসা, ভার্চুয়াল অফিস ও ভার্চুয়ালাইজড ব্যবসায়গুলি আরও বেশি পছন্দ করা শুরু হবে। মানুষেরা আরও বেশি অনলাইন ভিত্তিক বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপের সাথে পরিচিত হবে। ইন্টারনেটের ক্রিয়াকলাপ বাড়বে, কেবল সামাজিক যোগাযোগ এর জন্যই নয়, ব্যবসা পরিচালনা এবং নিয়মিত অফিস কার্যক্রম চালানোর জন্যও বটে।



খাদ্য সংস্থাগুলি ভার্চুয়াল সরবরাহ প্রক্রিয়ার উপর আরো বেশি নির্ভর করতে পারে। সরবরাহ এবং বিতরন সেবা গুলি আরও বেশি জনপ্রিয় হতে পারে এবং এই সংকটময় বৈশ্বিক অবস্থা শেষ হবার পরে তার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মানুষ আরও ব্যস্ত সময় পার করতে পারে। কৃষি ক্ষেত্রগুলি খাদ্য উৎপাদনে আরও জীবাণুমুক্ত এবং পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে, যেন এটি ভোক্তাদের অনেক বেশি পরিমান পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। মানুষের যেহেতু ভ্রমণ কম হবে সেহেতু তাদের শারীরিক কিছু রোগ ব্যাপক হারে দেখা দিতে পারে। যা নিরাময় এর জন্য নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা লাগতে পারে।

কীভাবে ব্যবসায়ের পতন কাটিয়ে উঠবেন?

COVID-19 সংকটের পরে ব্যবসায়িক সমস্যা গুলো কাটিয়ে উঠার উপায় গুলি অবশ্যই খুব একটা সহজ হবে না। এটিতে কোনও একক প্রক্রিয়া নেই বরং পতনটি যেন কম হয় সেই চেষ্টা করতে হবে এবং নির্ভুল পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। নিম্নলিখিত কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে যা COVID-19 কাটিয়ে উঠতে আপনাকে সাহায্য করতে পারে এবং আপনার ব্যবসাকে প্রভাবিত করতে পারে :

# প্রথমে ব্যবসায়ের উপর একটি বিশদ বিশ্লেষণ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ খাতগুলি ও ক্ষতির হার নির্ধারন করে নিয়মিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিগুলির সাথে তার তুলনা করতে হবে।

# এরপরে, আপনার হাতে থাকা অবশিষ্ট সম্পদটি বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করুন, সম্ভব হলে অন্যান্য পণ্যগুলিও পুনরায় ব্যবহার করুন। এই মুহুর্তে অপ্রয়োজনীয় অংশ গুলোতে খরচ করা বন্ধ করুন। আর যা আপনার প্রয়োজন নাই এমন পণ্য বিক্রি করে দিন এতে করে কিছু অতিরিক্ত টাকা আপনার হাতে আসতে পারে।

# ইন্টারনেট কে আপনার ব্যবসায়ের সাথে কিভাবে ব্যবহার করা যায়, তা ভাবুন।



# বাজারের প্রতিযোগীদের সাথে ব্যবসায়ের বর্তমান অবস্থার তুলনা করুন। তাদের ব্যবসায়ের উত্থান বা পতনের কারণ বিশ্লেষণ করুন।

# প্রয়োজনে ব্যবসায়ী নেতাদের অনুসরন করুন। এমনকি নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই সঙ্কটে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তারা কীভাবে এই সমস্যা থেকে নিজেকে পুনরুদ্ধার করছে তা পর্যবেক্ষণ করুন।

# নতুন অফিসে শুধু শুধু অর্থ খরচ করবেন না বরং এমন উৎস খুজে বের করুন যা ব্যবসায়ে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব দেয়।

# শক্তিশালী নেটওয়ার্কগুলি পুনর্নির্মাণ করুন এবং ইতিমধ্যে বিদ্যমান বিক্রেতাদের এবং ক্লায়েন্টদের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করুন।

# গ্রাহকদের পরবর্তী সমস্যাগুলি বুঝুন এবং অল্প সময়ের মধ্যে আপনার ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে এমন পণ্য মার্কেটে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন।

# অবশেষে, প্রায় সমস্ত দেশই তাদের দেশে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে উদ্দীপনা প্যাকেজ বরাদ্দ করছে। আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করুন। এই জাতীয় তহবিল আপনার ব্যবসায়ের জন্য একটি শুভ সূচনা হতে পারে।

অতিরিক্ত পরামর্শ

আশা এবং প্রার্থনা হ’ল বিশ্ব যেন এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে আশু মুক্তি লাভ করে। কিন্তু এই COVID-19 সঙ্কট বিশ্বব্যাপী একটি বড় প্রভাব রেখে যাবে। ব্যবসা বড়, মাঝারি বা ছোট যাই হোক না কেন, COVID-19 অনিবার্য ভাবে ব্যবসাকে প্রভাবিত করবে। এই জাতীয় সঙ্কটের সময়কালে ভাল পরামর্শ হ’ল কর্মক্ষেত্রকে নিরাপদ এবং স্যানিটাইজড রাখা। দূষণ এবং রোগের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারী পদ্ধতি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা সব সময় মনে রাখবেন।



অবশেষে, সরকারের সাথে সহযোগিতা করুন, অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসা গুলিকে সমর্থন এবং সহায়তা করুন যা আপনার সাহায্য ছাড়া এই সঙ্কটের সময়ে টিকে থাকতে পারবে না। শেষে অবশ্যই এটি মনে রাখতে হবে যে, আমরা একটি বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে থাকি। এমনকি ব্যবসায়িক বিশ্ব তার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র অনুসরন করে; যেখানে একটি ব্যবসা অন্যের ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। সর্বোপরি, কোনও একক ব্যবসা কোনো বাজারে স্বতন্ত্রভাবে চলতে পারে না। তাই সব ধরনের ব্যবসাকেই টিকিয়ে রাখতে হবে।

লেখকঃ শামসুল রাব্বী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button